খান জাহান আলী ট্রেডার্স

শীর্ষ মসলা ব্যবসায়ী এখন ঋণখেলাপি

চট্টগ্রাম ১৭ অক্টোবর: খাতুনগঞ্জের মসলা আমদানি-রফতানির সিংহভাগই নিয়ন্ত্রণ করেন বোম্বাইওয়ালাখ্যাত ব্যবসায়ীরা। এসব বোম্বাইওয়ালা ব্যবসায়ীর মধ্যে বড় সওদাগর ছিলেন খান জাহান আলী ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নূর মোহাম্মদ। পরিচ্ছন্ন লেনদেনের জন্য পথিকৃৎ এ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদানের জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতা করত ব্যাংকগুলো। কিন্তু ২০১৫ সালে কোকেন কেলেঙ্কারিতে জড়ানোর পর একের পর এক ব্যবসা হারিয়ে এখন ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে খান জাহান আলী ট্রেডার্স।

কোকেন চোরাচালান মামলায় গ্রেফতারের পর জামিনে বের হয়ে দেশ থেকে পালিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী নূর মোহাম্মদ। তার বাকি চারজন সহোদর দেশে থাকলেও আগের মতো ব্যবসা নেই প্রতিষ্ঠানটির। প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে মসলার আমদানি। এতে একসময়ের অন্যতম শীর্ষ মসলা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানটি এখন ঋণখেলাপি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভোগ্যপণ্য আমদানি করতে ২০০৭ সালে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের জুবিলী রোড শাখা থেকে ঋণ নেয় খান জাহান আলী ট্রেডার্সের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মেসার্স আক্তার ইমপেক্স। এরপর বিভিন্ন সময়ে এ ব্যাংকের মাধ্যমে পণ্য আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংকটির এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর ১০ কোটি টাকার বেশি পরিমাণ পণ্য আমদানি করত শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক জুবিলী রোড শাখার মাধ্যমে। লেনদেনও ছিল বেশ ভালো। তবে ২০১৫ সালে কোকেন মামলার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির লেনদেন খুবই কমে যায়। প্রতিষ্ঠানটি আমদানিও বন্ধ করে দেয়। এতে পণ্য আমদানির জন্য দেয়া ব্যাংকঋণের কিছু টাকা আটকে যায়। প্রতিষ্ঠানটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে ঋণটি পুনঃতফসিল করা হয়েছিল। কিন্তু এর পরও ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারেনি মেসার্স আক্তার ইমপেক্স। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের পাওনা সাড়ে ৭ কোটি টাকা শ্রেণীকৃত হয়ে গেছে।

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জুবিলী রোড শাখার ব্যবস্থাপক মো. হাবিবুল ইসলাম বলেন, যদিও এটি আমি এ শাখার দায়িত্ব নেয়ার আগের ঘটনা। যতটুকু শুনেছি এবং ব্যাংকের নথি থেকে জানতে পেরেছি, মেসার্স আক্তার ইমপেক্সের ব্যাংকে লেনদেন ছিল খুবই ভালো। ভোগ্যপণ্য আমদানির ঋণপত্রের বেশির ভাগ মূল্য নগদে পরিশোধ করত প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে পণ্য আমদানি বন্ধ করে দিলে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের ঋণ আটকে যায়। শাহজালাল ব্যাংকসহ মোট চারটি ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২০ কোটি ঋণ শ্রেণীকৃত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাওনাদার ব্যাংকের এক কর্মকর্তা।

খান জাহান আলী ট্রেডার্সের সঙ্গে ব্যবসায়িকভাবে যুক্ত অন্য ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ট্রেডিং, আমদানি, উৎপাদন খাতের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে খান জাহান আলী ট্রেডার্স ছিল ব্যবসায়ীদের কাছে লেনদেনের জন্য একটি কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠান। কিন্তু একটি ভুলই প্রতিষ্ঠানটির সব অর্জন ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জামাল হোসেন বলেন, নূর মোহাম্মদের পরিবারের সদস্যরা ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে নিয়ে গেলেও ব্যবসায়িক জৌলুস হারিয়েছে খান জাহান আলী ট্রেডার্স। শুধু তা-ই নয়, তাদের ব্যবসায়িক এ ধস খাতুনগঞ্জের বোম্বাইওয়ালা ব্যবসায়ীদেরও অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে।

সহপাঠী, ব্যবসায়িক সহযোগী ও খাতুনগঞ্জের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, নূর মোহাম্মদ ১৯৮১ সালে মুসলিম এডুকেশন হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর নব্বইয়ের দশকে পিতার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে খাতুনগঞ্জের ট্রেডিং ব্যবসায় আসেন। আদি পুরুষ ভারতের গুজরাটের বাসিন্দা হলেও খাতুনগঞ্জের ট্রেডিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল তাদের পরিবার। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর নূর মোহাম্মদের দাদা ভারতের গুজরাট থেকে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দাদার পর নূর মোহাম্মদের পিতা মো. আবদুল কাদের খাতুনগঞ্জে ট্রেডিং ব্যবসাকে সম্প্রসারণ করেন। নূর মোহাম্মদ ব্যবসায় আসার পর ট্রেডিংয়ের পরিবর্তে আমদানি এবং পরে শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। পাশাপাশি অপর তিন ভাই যথাক্রমে মোহাম্মদ আকতার, মোহাম্মদ ইয়াছিন ও মোহাম্মদ মোস্তাককেও পারিবারিক ব্যবসায় নিয়ে আসেন।

দেশে কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু হলে খান জাহান আলী ট্রেডার্স মারকারি ব্র্যান্ডের এজেন্ট হয়। এছাড়াও গাউসিয়া ফিড, গাউসিয়া পোলট্রি, শাহ্ আমানত ফিলিং স্টেশন, প্রাইম হ্যাচারি, সাতক্ষীরা চিংড়ি ঘের, খান জাহান আলী কম্পিউটার, শাহ আমানত নিটিং অ্যান্ড ডায়িং ইন্ডাস্ট্রিজের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করতেন নূর মোহাম্মদ। কোকেন কেলেঙ্কারির ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা-বাণিজ্য ৯০ শতাংশই কমে গেছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি খোদ মেমনদের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান খান জাহান আলী ট্রেডার্সের সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করে দেয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের ৬ জুন চট্টগ্রাম বন্দরে কোকেন সন্দেহে আমদানীকৃত তেলের ড্রাম জব্দ করেন শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ৮ জুন ১০৭টি ড্রামের প্রতিটিতে ১৮৫ কেজি করে সানফ্লাওয়ার তেল পাওয়া যায়। ২৮ জুন তেলের নমুনা শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের উন্নত ল্যাবে পরীক্ষা করে এক ড্রাম কোকেন পাওয়া যায়। এরপর পুলিশ ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় খান জাহান আলী ট্রেডার্সের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান প্রাইম হ্যাচারির ম্যানেজার গোলাম মোস্তফা সোহেলকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯-এর ১ (খ) ধারায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান খান জাহান আলী লিমিটেডের চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ ও গোলাম মোস্তফা সোহেলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এ মামলায় এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। নূর মোহাম্মদকে কয়েক দফা রিমান্ডেও নেয় পুলিশ। মূলত এরপর থেকেই খাতুনগঞ্জের বাণিজ্যের অন্যতম শীর্ষ এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় ধস নামে।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।