করোনায় সিমেন্ট খাতের ক্ষতি ৩ হাজার কোটি টাকা

ভোরের বার্তা, ঢাকা ২০ জুন ২০২০ : ”করোনা ভাইরাস শনাক্তের পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে সিমেন্ট খাতে ক্ষতি হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা”। ”সরকারের সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর এপ্রিলে সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর ৯০ শতাংশ সিমেন্ট উৎপাদন বন্ধ ছিল, যা বর্তমানে ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে”। ”এ অবস্থায় শিল্প খাতটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে সিমেন্টের ওপর ৩ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের পাশাপাশি ক্লিংকার আমদানির ওপর বিদ্যমান শুল্ক কমানোর দাবি জানিয়েছেন সিমেন্ট খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ)”।

”গত দুই দশকে দেশে সিমেন্টের ব্যবহার কয়েক গুণ বেড়েছে”। ”২০০০ সালে মাথাপিছু সিমেন্টের ব্যবহার ছিল মাত্র ৪৫ কেজি”। ”এ মাথাপিছু সিমেন্টের ব্যবহার ২০১৫-তে এসে দাঁড়ায় ১৩০ কেজিতে, যা ২০১৬-তে ১৫৩ কেজি, ২০১৭-তে ১৬৫ কেজি, ২০১৮-তে ১৮৮ কেজি এবং ২০১৯-এর শেষে এসে ২০০ কেজিতে উন্নীত হয়”। ”এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ক্রমবর্ধমান বাজারে নিজেদের অবস্থান সংহত করতে বেশ কয়েক বছর ধরেই উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে সিমেন্ট খাতের কোম্পানিগুলো”। ”চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি উৎপাদন সক্ষমতার কারণে এ খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে বাজার দখলের প্রতিযোগিতা বেশ তীব্র”। ”এর ফলে কোনো কারণে সিমেন্ট উৎপাদনের ব্যয় বাড়লেও সব কোম্পানির সমন্বিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সিমেন্টের দাম বাড়ানোর সুযোগ সীমিত”। ”তাছাড়া কোনো কোম্পানি সিমেন্টের দাম বাড়ালে প্রতিযোগী কোম্পানি বাজার দখলের জন্য দাম কমিয়ে দেয়ার নজিরও রয়েছে”। ”দেশের সিমেন্টের বাজারের ৮১ শতাংশই শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের দখলে”। ”এর মধ্যে বাজার হিস্যার দিক দিয়ে শীর্ষে রয়েছে শাহ সিমেন্ট”। ”তাছাড়া লাফার্জহোলসিম, বসুন্ধরা, সেভেন রিংস, হাইডেলবার্গ, এমআই সিমেন্ট, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, ফ্রেশ সিমেন্ট, আকিজ সিমেন্ট ও কনফিডেন্স সিমেন্ট দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড”।

”বিসিএমএ সভাপতি ও ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মো. আলমগীর কবির জানান, দেশের উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং অবকাঠামো খাতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করে সিমেন্ট খাতে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি হয়ে আসছিল”। ”তবে গত বছর এ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশে নেমে আসে”। ”এর অন্যতম কারণ ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া, অসমন্বয়যোগ্য অগ্রিম আয়কর, তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে সিমেন্টের নিম্নমুখী দামের প্রবণতা এবং নদী ও সড়কপথে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া”। ”ফলে প্রায় সব সিমেন্ট কোম্পানিকে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়”। ”এ অবস্থায় চলতি বছরের শুরুতে সিমেন্ট খাত ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আঘাত হানে নভেল করোনাভাইরাস”। ”সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি শুরু হওয়ার পর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সিমেন্ট কারখানাগুলোতে ৯০ শতাংশ উৎপাদন বন্ধ ছিল, যেটা এখন ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে”। ”অথচ শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের পাশাপাশি অন্যান্য নিয়মিত খরচও বহন করতে হচ্ছে। অর্থাৎ পরিচালন ব্যয় কমেনি”। ”এ পরিস্থিতি কতদিন চলবে, সেটি এখনো বোঝা যাচ্ছে না”।

”গত দুই-আড়াই মাসে সিমেন্ট খাতে যে ক্ষতি হয়েছে, তাতে এ খাতটি এক বছর পিছিয়ে গেছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা”। ”তারা বলছেন, এ পরিস্থিতি যদি আরো একমাস চলে, তাহলে সিমেন্ট খাত আরো দুই বছর পিছিয়ে যাবে”। ”আর দুই মাস প্রলম্বিত হলে খাতটি পিছিয়ে যাবে চার থেকে পাঁচ বছর”। ”সিমেন্টের কাঁচামাল শতভাগ আমদানিনির্ভর হওয়ায় এ পর্যন্ত যত এলসি খোলা হয়েছে, সেটিও এখন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে”। ”অথচ বর্তমানে ছোট-বড় সব ধরনের নির্মাণকাজ প্রায় ৯০ শতাংশই বন্ধ রয়েছে”। ”সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতেই সিমেন্টের চাহিদা কমেছে”। ”এতে ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে”।

”করোনার পাশাপাশি বর্তমানে অসমন্বয়যোগ্য অগ্রিম আয়কর সিমেন্ট খাতের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে বিসিএমএ সভাপতি বলেন, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো সিমেন্ট খাতে অসমন্বয়যোগ্য ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর নির্ধারণ করা হয়”। ”পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এ ধরনের বিধান রয়েছে বলে আমাদের জানা নেই”। ”কোনো কোম্পানির মুনাফা হোক বা না হোক তাকে ৫ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর দিতেই হবে”। ”সিমেন্ট উদ্যোক্তারা সরকারি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে অনেক দেনদরবারের পর এ অগ্রিম আয়কর ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে”। ”তবে অসমন্বয়যোগ্য এ ৩ শতাংশ অগ্রিম আয়করের কারণে সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর পুঁজি থেকে অর্থ চলে যাচ্ছে”। ”তাই আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ অগ্রিম আয়কর পুরোপুরি প্রত্যাহার অথবা এটিকে সমন্বয়যোগ্য কর হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান তিনি”।

”জানা গেছে, বর্তমানে সিমেন্টের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানিতে টনপ্রতি ৫০০ টাকা শুল্ক দিতে হয়”। প্”রতি টন ক্লিংকার বর্তমানে ৪২ ডলার হিসাবে আমদানি করা হয়, ফলে ৫০০ টাকা আমদানি শুল্ক ১৪ শতাংশে দাঁড়ায়”। ”এ আমদানি শুল্ক কমপক্ষে ৫ শতাংশ কিংবা টনপ্রতি ৩০০ টাকা নির্ধারণের দাবি খাতসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর”।

”২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত সব সিমেন্ট কোম্পানির অসমন্বিত অগ্রিম আয়কর বাবদ সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা সরকারের কোষাগারে জমা রয়েছে উল্লেখ করে মো. আলমগীর কবির বলেন, আয়কর অধ্যাদেশ অনুসারে করদাতার পরিশোধিত টাকা পরিশোধযোগ্য করের চেয়ে বেশি হলে তা ফেরত পাওয়ার যোগ্য”। ”ফেরত দিতে দেরি হলে সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত না তা ফেরত দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার ওপর ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে সুদ প্রদান করবে”। ”কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, ফেরতযোগ্য বিপুল অংকের এ অর্থ বছরের পর বছর পড়ে থাকে এবং বারবার আবেদন করা সত্ত্বেও তা নগদে ফেরত পাওয়া যায় না”। ”আমরা প্রণোদনা চাই না, আমাদের প্রাপ্য আয়করের অর্থ ফেরত দেয়া হোক সেটি চাই”।

”বিসিএমএ জানিয়েছে, বর্তমানে সক্রিয় সিমেন্ট কারখানা রয়েছে প্রায় ৩৫টি”। ”দেশে সিমেন্টের চাহিদা বছরে ৩ কোটি ৫০ লাখ টন হলেও কারখানাগুলোর মোট উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে ৮ কোটি টন”। ”আগামী তিন বছরে এর সঙ্গে আরো ১ কোটি ১০ লাখ টন সক্ষমতা যোগ হবে”। ”এ খাতে উদ্যোক্তাদের প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে”। ”এর মধ্যে ব্যাংকঋণ রয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি”। ”তাছাড়া এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখেরও বেশি নির্মাণ শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা জড়িত”।

”গতকাল অনলাইনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের সিমেন্ট খাতের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন বিসিএমএর প্রেসিডেন্ট মো. আলমগীর কবির”। ”এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মেট্রোসেম সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহীদুল্লাহ”।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।