তিনি ছিলেন আমাদের সংগ্রাম, সাহস ও প্রেরণার উৎস

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। কুড়িয়ে আনা খড়, পাতা, বাঁশের, গাছের ছাল-বাকল, ডাল ও  গুঁড়ি  দিয়ে কী নিপুণভাবে তিনি একে একে অসাধারণ সব শিল্পকর্ম তৈরি করতেন। সেই শিল্পকর্ম যে কত আধুনিক, কত জীবনঘনিষ্ঠ ও যুগোপযোগী, শিল্পপ্রেমিক মানুষ তা অনুধাবন করতে পারেন। এই নান্দনিক মানুষটির অনবদ্য শিল্পকর্মই শুধু নয়, ব্যক্তি মানুষটিও সবার কাছে শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় অনন্য। প্রকৃতির সহজ-সরল রূপের মধ্যে তিনি দেখেছিলেন শিল্পের অমিত সম্ভাবনা। তাই দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা এই নারী বলতেন, ‘আমি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে হাতে-কলমে শিক্ষা নিইনি, আমি পরম আগ্রহে ভালোবাসার সঙ্গে শিক্ষা নিয়েছি প্রকৃতির পাঠশালা থেকে।’ আর এর মধ্য দিয়েই আধুনিক চিন্তা-চেতনায় প্রগতির পথে হাঁটা এই মানুষটি শিল্পের ক্ষেত্রে নিজেকে অনিবার্য করে তুলেছেন। পেয়েছেন সব শ্রেণির শিল্প সচেতন মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা। শিল্পের এক মানবিক কারিগর বলা যায় তাঁকে। শিক্ষাগুরু ও অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে তিনি যাঁকে স্বীকার করেন, তিনিও এক মহান শিল্পী, এস এম সুলতান।

আমার সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা ও পরিচয় ১৯৯১ সালে যশোরে। চারুপীঠ আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে। এই প্রদর্শনী তাঁর জীবনে উল্লেখযোগ্য। কারণ প্রদর্শনীর শেষে ‘চারুপীঠ’-এর সহযোগিতায় এস এম সুলতান এক সংবর্ধনার আয়োজন করে তাঁকে ভাস্কর হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এর পর থেকে তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে পাঁচটি একক এবং সাতটি যৌথ প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশের মানুষকে পরিচিত করে তোলেন ভিন্ন এক নান্দনিক শিল্পের সঙ্গে।

পাক্ষিক অনন্যার কারণে আমার সঙ্গেও গড়ে ওঠে এক চমৎকার সম্পর্ক, যা আমাকে আরো কাছে থেকে তাঁকে  দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল। লেখালেখি, বিভিন্ন প্রদর্শনী ও তাঁর অসুস্থতার খবর পেয়ে যেতে হতো তাঁর কাছে। তখন দেখেছি নিপুণ যত্নে সাজানো তাঁর সংসার ও ভালোবাসার পরিমণ্ডল। তাঁর কাছে যাওয়া মানেই ছিল সৃষ্টিশীলতার কাছে যাওয়া। সংসারকে অবহেলা করে নয়, মর্যাদা দিয়ে সব কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করে তিনি শিল্পকর্ম, বন্ধু-সুহৃদ ও চারপাশের মানুষের সুখে-দুঃখে ছুটে যেতেন। পশুপাখিদের না খাইয়ে তিনি কখনো নিজে খেতেন না। অসুস্থ স্বামীকে সারা জীবন গভীর আন্তরিকতা নিয়ে আগলে রেখেছেন, সেবা করেছেন। নাতি প্রিয়দর্শনকে খুব ভালোবাসতেন তিনি।

তিনি বিশ্বাস করতেন, মেয়েরা বাইরের কাজ করবে; কিন্তু ঘরকে অবহেলা করে বা সময় না দিয়ে নয়। দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন তাঁর আদর্শ। পাশাপাশি থাকতেন। আনন্দ-বেদনা, যন্ত্রণা তাঁর সঙ্গে ভাগ করতেন, পরামর্শ নিতেন। প্রিয়ভাষিণীর আরেকটি পর্ব, যাকে আমরা বীরত্বগাথা বলতে পারি, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অপরিহার্য গৌরবোজ্জ্বল অংশ। সাংবাদিক হিসেবে আমার প্রবল আগ্রহ ছিল তাঁর সাহস, মাতৃপ্রেম ও একাত্তরের দুরন্ত সময় সম্পর্কে জানা; যার বাঁকে বাঁকে রয়েছে অতল অন্ধকার এবং বঞ্চনার মর্মান্তিক চিত্র।

প্রিয়ভাষিণীর বাবার বাড়ি ফরিদপুর, নানার বাড়ি নড়াইলে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঢাকায় নারী শিক্ষা মন্দিরে এবং যশোর এমএম কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেন। মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন তিনি ২৫ বছরের তরুণী। টেলিফোন অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন খালিশপুরের ক্রিসেন্ট মিলে। স্কুলে পড়ার সময়ই তিনি নিজের পছন্দে বিয়ে করেন সহায়-সম্বলহীন এক বেকার ছাত্রকে। সেই সময়ই এই উদ্যোগী নারী বাড়ি বাড়ি টিউশনি করে সংসার চালাতেন। একে একে তিনি তিন ছেলের মা হন এবং তাদের জন্মের পর স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক বিপর্যয় যখন আসে তখন ছেলেদের তিনি তাঁর মায়ের কাছে রেখে আসেন। শুরু হয় আরেক নতুন জীবন, সেদিন সেটা ছিল একা একজন মেয়ের বাঁচার লড়াই, যা সমাজে তখন গৌরব লাভ করেনি। একটি সামরিক যুদ্ধ কিভাবে একজন উপায়হীন নারীকে সারা জীবনের যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দেয়, সেই চিত্র উঠে এসেছে প্রিয়ভাষিণীর লেখা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে। সহজ-সরল ভাষায় লেখা সুপাঠ্য বইটিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আর দেশীয় রাজাকার-আলবদর-দালালদের সহিংসতার-বর্বরতার নিষ্ঠুর চিত্র উঠে এসেছে। হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠে এসেছে তা, সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় দৈনন্দিন ও বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার চিত্রও এই গ্রন্থে এসেছে। প্রিয়ভাষিণী ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষে নতুন দেশ, নতুন সরকার এলো, যে দেশের জন্য তিনি ধর্ষিতা হলেন, সেই দেশ কিন্তু তাঁর মুখের খাবার কেড়ে নিল। স্বাধীন দেশে তাঁর ক্রিসেন্ট জুট মিলের চাকরিটা আর থাকল না। আপনজন, আত্মীয়স্বজনের কাছে পরিচয় হলো একজন ধর্ষিতা হিসেবে। লজ্জা-সংকোচ ঝেড়ে ফেলে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালেন তিনি। নিজেকে সমর্পণ করলেন শিল্পের কাছে। সেটাই হয়ে উঠল যেন তাঁর জীবনের বিকল্প আশ্রয়।

প্রিয়ভাষিণী কাজ করেছেন কানাডিয়ান হাইকমিশন, ইউনিসেফ, ফাও ও গণসাহায্য সংস্থায়। মাহবুব আলম তরুণ তৈরি করেছেন তাঁর শিল্প ও জীবন নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি। প্রিয়ভাষিণী বলতেন, শিল্পের জন্য শিল্প নয়, জীবনের জন্যই শিল্প। প্রিয়ভাষিণী আমাদের সংগ্রাম ও সাহস। স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত এই সৃষ্টিশীল, নান্দনিক মানুষটিকে আমরা যেন কখনো ভুলে না যাই। তাঁর সংগ্রাম ও সৃষ্টিশীলতার কাছে আমাদের যেন বারবার ফিরে আসতে  হয়।

লেখক : সাংবাদিক

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।