দলে ফিরবেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে টাঙ্গাইল তথা কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৃনমূল নেতা কর্মীরা বলছে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী দলে ফিরবেন। বিভিন্ন সূত্রেও দলে ফেরার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে জোরেশোরে। এদিকে সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী নির্বাচনে অংশ নিবে কি? ‘না’ তা নিয়ে কোন মন্তব্য না করলেও স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে তিনি বরাবরই বলে যাচ্ছেন ‘ নেত্রী শেখ হাসিনা যখন চাইবেন তখনই তিনি দলে ফিরবেন, চাইলে নির্বাচনও করবেন; তিনি এখনও আওয়ামীলীগ করেন’।

জানাযায়, টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে বর্তমান সংসদের এমপি হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারী, কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান মোজহারুল ইসলাম তালুকদার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি(১) ব্যবসায়ী ইঞ্জিনিয়ার মো. লিয়াকত আলী, এফবিসিসিআই’র পরিচালক ও আওয়ামী লীগ নেতা আবু নাসের এবং জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক সোলায়মান হাসান দলীয় মনোনয়ন কিনে জমা দিয়েছেন। এ আসনে বর্তমান সংসদের এমপি হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারীর সাথে উপজেলা ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের নানা বিষয় নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে, নেতাকর্মীরা তার আচরণ ও কর্মকান্ডে বিক্ষুব্ধ। উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এমপি হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারী ব্যতিত যে কোন প্রার্থীকে দলীয় মনোনয়ন দেয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এতেই ফের আলোচনায় এসেছেন নিইয়র্কে বেফাঁস কথা বলে মন্ত্রীত্ব হারানো দল থেকে বহিস্কৃত নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকী।

হজ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করার তিন বছর পর ২০১৭ সালে হজ করে প্রথম আলোচনায় আসেন বর্ষিয়ান এ নেতা। চলতি বছরের ১১ মে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে দ্বিতীয়বার আলোচনায় আসেন তিনি। প্রধান অতিথি হিসেবে ওই সম্মেলন উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্মেলনে ‘সম্মানিত দর্শকদের’ জন্য সংরক্ষিত আসনের প্রথম সারিতে বসেন পদচ্যুত ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী। লতিফ সিদ্দিকীর বাম পাশের আসনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম এবং ডান পাশের আসনে দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি বসেন। ওই সম্মেলনে লতিফ সিদ্দিকীর যোগ দেয়া এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের পাশে বসা অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এটাকে অনেকেই ওই সময় লতিফ সিদ্দিকীর আওয়ামী লীগে ফেরার ইঙ্গিত বলে মনে করেন। সে সময় লতিফ সিদ্দিকী কোন মন্তব্য না করলেও তাঁর কাছের লোকদের বলেন ‘অপেক্ষার ফল সব সময় সুমিষ্ট হয়’।

জেলা-উপজেলার রাজনৈতিক বোদ্ধারা মনে করেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঢামাঢোল শুরু হওয়ার পর টাঙ্গাইল-৪(কালিহাতী) আসনে নানা মেরুকরণ চলছে। বর্তমান সংসদের এমপির বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছে উপজেলা আওয়ামীলীগ। কৃষক শ্রমিক জনতালীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম জাতীয় ঐক্যফ্রণ্টে যোগ দেয়ায় নির্বাচনী মাঠ গরম হয়ে ওঠছে। বিএনপির ঝিমিয়ে পড়া নেতাকর্মীরা গা-ঝাড়া দিয়ে বঙ্গবীরের গুনগান গাইছেন। তাদের ধারণা, ঐক্যফ্রণ্টের হয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এ আসনে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী লড়বেন। সেক্ষেত্রে কাদের সিদ্দিকীর বিজয়ী হওয়া অনেকটাই সহজ হবে। এ আসনে বঙ্গবীর প্রার্থী হলে আওয়ামীলীগ বা মহাজোটের প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশীদের যেই হোন নির্বাচিত হওয়া অনেকটাই দুস্কর। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী হলে ফলাফল উল্টে যাওয়ার সমুহ সম্ভাবনা রয়েছে। বিষয়টি আওয়ামীলীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে থাকায় মহান মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলের সংগঠক আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার হলেও হতে পারে- এমন বিস্তর আলোচনাও হচ্ছে।

প্রাজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট টাঙ্গাইল-৪(কালিহাতী) আসনটি ধরে রাখতে চাইলে নেতা লতিফ সিদ্দিকীর বিকল্প নেই। আবদুল লতিফ সিদ্দিকীও জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডাকের অপেক্ষায় রয়েছেন। লতিফ কেউ কেউ আবার আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর সহধর্মিনী সাবেক এমপি বেগম লায়লা সিদ্দিকীকে নিয়ে আসনটি ধরে রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন। লতিফ সিদ্দিকীর ঘণিষ্ঠজনদের কেউ কেউ বলছেন, লতিফ সিদ্দিকী ও লায়লা সিদ্দিকীর একজন নির্বাচনে আসছেন। গণমাধ্যমকে এড়ানোর জন্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ডাকনাম ‘আরজু’ এবং বেগম লায়লা সিদ্দিকীর ডাকনাম ‘রুকু সুলতানা’ নামে আওয়ামীলীগের দুটি দলীয় মনোনয়নপত্রও সংগ্রহ করা হয়েছে। এ বিষয়ে লতিফ সিদ্দিকী কোন মন্তব্য করেন নি।

স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, কালিহাতী উপজেলা আওয়ামীলীগ তাঁর(লতিফ সিদ্দিকীর) হাতে গড়া সংগঠন। উপজেলা আ’লীগের শীর্ষ নেতা থেকে সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনের ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরা পর্যন্ত তাঁর ইশারার অপেক্ষায় থাকে। তিনিও তৃণমূলের সবচেয়ে অবহেলিত কর্মীটির নাম-বাবার নাম নির্ধিধায় বলে দিতে পারেন। ব্যক্তি লতিফ সিদ্দিকী এখনও অনেকের কাছে আইকন। তিনি আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন(!) এমন খবরে উচ্ছ্বসিত আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দলীয় প্রধানের কাছে লতিফ সিদ্দিকীকে আবারও কালিহাতীতে ফিরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে নানা রকম পোস্ট দিচ্ছেন। তাদের দাবি, কালিহাতীর দ্বিধাবিভক্ত আওয়ামীলীগকে ঐক্যবদ্ধ করতে লতিফ সিদ্দিকীকে প্রয়োজন।

এদিকে, দল থেকে বহিস্কার হওয়ার পর বিগত ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর আবদুল লতিফ সিদ্দিকী সংসদে ঐতিহাসিক বক্তব্য রেখে পদত্যাগ করেন। এ সময় তিনি নিজেকে সাচ্চা মুসলমান বলে দাবি করেন, হজ নিয়ে বিরূপ বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশও করেন। শূন্য আসনে ২০১৭ সালের ৩১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী হাছান ইমাম খান বিজয়ী হন। বিজয়ী হওয়ার পর থেকেই উপজেলা আওয়ামীলীগের সাথে নানা বিষয় নিয়ে তার বিরোধ সৃষ্টি হয়। আ’লীগ নেতাদের অভিযোগ, এমপি হাছান ইমাম খান জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে চলাফেরা করেন, সভা-সমাবেশে যান। সিনিয়র নেতাদের কটাক্ষ করে বক্তব্য রাখেন। খুনের মামলার আসামিদের পক্ষে ডিও লেটার দেন। থানা পুলিশ দিয়ে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের হয়রানী করেন। এমপি হাছান ইমাম খানের বক্তব্য, উপজেলা আ’লীগ কোন সভা-সমাবেশে তাকে ডাকেন না, তিনি নিজেই গিয়ে উপস্থিত হন।

দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান মোজহারুল ইসলাম তালুকদার এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি(১) ব্যবসায়ী ইঞ্জিনিয়ার মো. লিয়াকত আলী বলেন, জননেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বিজ্ঞ রাজনীতিক, কালিহাতীর অভিভাবক। তিনি দলীয় মনোনয়ন পেলে তারা খুশি।

উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ আনছার আলী বিকম বলেন, দাদা(লতিফ সিদ্দিকী) আমাদের অভিভাবক। কোথায় কী বলেছেন সেজন্য দল তাকে বহিস্কার করেছে, বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করার ক্ষমতাও দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। দাদাকে দলীয় মনোনয়ন দিলে কালিহাতীর মানুষ ‘মুক্তি’ পাবে। উপজেলা আ’লীগ সব সময় তাঁর ভালো কাজের সাথে ছিল ভবিষ্যতেও থাকবে।
প্রকাশ, আওয়ামীলীগের তৎকালীন সভাপতি মন্ডলীর সদস্য ও মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সফরে গিয়ে টাঙ্গাইল সমিতির এক সভায় হজ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন। ওই বক্তব্য বাংলাদেশে গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে প্রথমে মন্ত্রিসভা এবং পরে দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে দেয়া বক্তব্য প্রকাশের পর ধর্মানুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন জেলায় লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ১৮টি জেলায় ২২টি মামলা হয়। সেসব মামলার বিচার এখনও শেষ হয়নি। ২০১৪ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে ধানমন্ডি থানায় হঠাৎ উপস্থিত হয়ে আত্মসমর্পণের পর কারাগারে যান লতিফ সিদ্দিকী। ২০১৬ সালের ২৯ জুন জামিনে মুক্ত হন তিনি। এরপর সংসদে গিয়ে ঐতিহাসিক বক্তব্য রেখে টাঙ্গাইল-৪ আসন থেকে পদত্যাগ করেন লতিফ সিদ্দিকী।

জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর চুপচাপ থাকা লতিফ সিদ্দিকী নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিলেও দলের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করেন। দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘দেবী’ বলে সম্বোধন করেন, জনগনকে শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানান। চলতি বছরের মে মাসে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে লতিফ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমি কেন দল থেকে বহিস্কৃত হয়েছি, কেন কারাগারে গিয়েছি তা আমিই ভালো জানি। দল থেকে বহিস্কার হলেই দলকে বহিস্কার করা যায় না। আওয়ামী লীগের জন্মদাতা নেতাদের মধ্যে আমিও একজন।’

শর্টলিংকঃ

১ thought on “দলে ফিরবেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী

  1. আমার জানা মতে নেতা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী কালিহাতী মাটি ও মানুষের প্রানের স্পন্দন তাকে পেলে তারা আর কাউকেই চাইবে না তাই নেত্রী (জন নন্দিত প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার) প্রতি আকুল আবেদন আমাদের মাঝে নেতা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে আবার ফিরিয়ে দিন। তার বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করেন আমাদের আবার প্রান ভরে নিঃশাস নিতে দেন। আমরা আবার নেতা লতিফ সিদ্দিকীকে সংসদে চাই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।