‘মশা নিধনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে’

নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেছেন, গত বছর যখন মশা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলো এবং নগরবাসী ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলো তখন সবাই আশা করছিল যে ভবিষ্যতে অন্তত এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সে জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে দুটি সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিয়েছে এবং কিছু কাজ তারা করেছে, তবে মশার উৎপাত কমেনি। মশা নিয়ন্ত্রণ বা নিধনের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। যেসব জায়গায় মশা উৎপাদিত হয় সেসব জায়গাই অপরিচ্ছন্ন থেকে যায়। সিটি করপোরেশন ময়লা পরিষ্কার করলেও ডোবা-নালায় প্রায় অর্ধেক থেকে যায়। মশা নিধনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা করতে হবে।

অধ্যাপক আকতার মাহমুদ শুক্রবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ইনডিপেনডেন্ট টিভির টক শো ডেটলাইন ঢাকা অনুষ্ঠানে ‘মশার উৎপাত’ বিষয়ে আলোচনায় এসব কথা বলেন। এটি সঞ্চালনা করেন গোলাম কিবরিয়া।

অধ্যাপক আকতার মাহমুদ আরো বলেন, ‘মশা প্রতিরোধের জন্য আমরা যে কয়েল, অ্যারোসল স্প্রে বা ধূপ ব্যবহার করি—এগুলোর সবই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এর পরও যেহেতু এগুলো আমাদের ব্যবহার করতে হবে, তাতে কতটুকু পরিমাণ সংশ্লিষ্ট উপাদান থাকবে, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে একটি ডোজ সুপারিশ করেছে। কত শতাংশ মেডিসিন ব্যবহার করা যাবে তা-ও বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক কয়েল আছে, যা কোথা থেকে আমদানি করা, তা জানা যায় না। এসব কয়েল জ্বালালে দেখা যায় টিকটিকি মরে পড়ে থাকে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটুকু, তা দেখতে হবে। শিশুদের ঘুমের সময় কয়েল জ্বালানো ঠিক না। কারণ নাক দিয়ে ধোঁয়া যায়। অ্যারোসল ব্যবহারের একটি মাত্রা আছে। বিএসটিআই মাঝেমধ্যে অননুমোদিত কয়েল চিহ্নিত করে তা বন্ধ করে। কিন্তু তাদের হয়তো লোকবল কমের কারণে এটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয় না।’ তিনি বলেন, যেসব কয়েলের কোনো নাম-ঠিকানা নেই, সেগুলো ব্যবহার করা উচিত নয়। কয়েল জ্বালিয়ে ঘরে ঘুমানো যাবে না। অ্যারোসল স্প্রে করার ২০ মিনিট পর ঘরে ঢুকতে হবে। জনগণকে সচেতন হতে হবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ডেইজি সারোয়ার বলেন, ‘অনেক দিন একই ওষুধ ব্যবহারের কারণে মশা প্রতিরোধ ক্ষমতা বা কার্যকারিতা কমে যায়। সে জন্য আমরা পুরনো ওষুধের পরিবর্তে নতুন ওষুধ এনেছি। মশা এমন একটি বিষয়, কবে এটি নিয়ন্ত্রণ হবে, তা কেউ বলতে পারবে না। তবে যত দিন এটি নিয়ন্ত্রণে না আসবে তত দিন আমরা ওষুধ স্প্রে করার কাজ চালিয়ে যাব। মশার ডিম্বাণু ধ্বংসের জন্য সকালে একটি ওষুধ দেওয়া হয়। আর বিকেলের দিকে দেওয়া হয় আরেকটি ওষুধ। এ কাজে আমাদের ১৭০ জন কাজ করছে। এ সংখ্যা আরো যাতে বাড়ানো যায় সে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ওষুধে কাজ না হওয়ায় অনেকে বলছে এতে দুর্নীতি হয়েছে। আসলে এ ধরনের কোনো দুর্নীতি হয়নি। তিনি আরো বলেন, ‘চিকুনগুনিয়া হওয়ার সময় থেকেই আমরা যে মেডিসিন দিচ্ছিলাম, সে ধারাবাহিকতা এখনো আছে। প্রত্যেক ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে বলা হচ্ছে মেডিসিন দিতে। আমরা স্পেশাল ক্রাশ প্রগ্রাম শুরু করেছি, যাতে আবারও মশা না হয় সে জন্য মেডিসিন পরিবর্তনও করা হয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে চিকুনগুনিয়া বা ডেঙ্গু কন্ট্রোলে থাকবে।’

মশা গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘শীতের পর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মশার ডিমগুলো একযোগে ফুটেছে। এ কারণে সম্প্রতি মশার উৎপাত বেড়ে গেছে। আমরা জানি যে ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকে বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত মশা বাড়তে থাকবে। এর ভিত্তিতে আমাদের সিটি করপোরেশন বা সংশ্লিষ্টরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারে। ঢাকা শহরে প্রধানত এডিস মশা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা—এই তিনটি রোগ ছড়ায়। কিউলেস মশা ঢাকায় কোনো রোগ ছড়ায় না; কিন্তু উত্তরবঙ্গে ফাইলেরিয়া রোগ ছড়ায়। এতে হাত-পা বা যেকোনো অঙ্গ ফুলে যায়। ঢাকায় যখন বৃষ্টিপাত হয় তখন এডিস মশা বেড়ে যায়। এডিস মশা বেড়ে গেলে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া রোগও বেড়ে যায়।’

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।