লাশকে জিম্মি করে টাকা আদায়ের অভিযোগ

টাঙ্গাইলে কবরস্থানে লাশ দাফনকে কেন্দ্র করে লাশ প্রতি ২০ হাজার টাকা ফি নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে । সদর উপজেলার পোড়াবাড়ী ইউনিয়নের খারজানা আলীয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন কবরস্থানে এ প্রথা চালু করা হয়েছে। লাশকে জিম্মি করে টাকা আদায়ের চালু হওয়া এ অলিখিত প্রথার ফলে মৃতদেহ দাফন করতে না পারাসহ ভয়াবহ সমস্যার সম্মুখিন হচ্ছেন স্থানীয়রা। লাশ দাফনে ফি আদায়ের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কারণে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা এ প্রথা বন্ধে কার্যকর ভূমিকাও রাখতে পারছেন না হতদরিদ্র খারজান গ্রামবাসী। আধুনিক এ সভ্যতার যুগে মধ্যযুগীয় বর্বর এই প্রন্থায় টাকা উপার্জনকারীদের ক্ষমতার মূল উৎস কোথায় জানতে চায় নীরিহ ও ভুক্তভোগী খারজানা গ্রামবাসি। বর্বরাচিত এ অপরাধে লিপ্তদের আইনের আওতায় আনা হবে কিনা এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন ভুক্তভোগীরা।

জানা যায়, ১৯৮২ সালে ৩৮ শতাংশ স্থানীয়দের দানকৃত জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় খারজানা কবরস্থান। খারজানা গ্রামের প্রায় সহস্রাধিক মানুষের লাশ দাফনের প্রয়োজনে এ কবরস্থানটি স্থাপিত হয়। এ কবরস্থানের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার স্বার্থে দুই বছর মেয়াদী একটি পরিচালনা কমিটি গঠণের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ধারাবাহিক ভাবে ও পরিচালনা কমিটির তত্বাবধানেই পরিচালিত হয়ে আসছে কবরস্থানের উন্নয়ন আর রক্ষণাবেক্ষণ। এই কবরস্থানে প্রতিষ্ঠাকালে লাশ দাফন বাবদ ছিলনা কোন ধরনের ফি ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কবরস্থান পরিচালনার বর্তমান কমিটির মেয়াদকাল শেষ হলেও জোড়পূর্বক দায়িত্ব চালিয়ে যাচ্ছে এ কমিটি। এ কমিটিই দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অলিখিত ভাবে এ লাশ দাফন বাবদ ২০ হাজার টাকা জমা দেয়ার প্রথাটি চালু করেন। এ প্রথা চালুর ক্ষেত্রে স্থানীয়দের কোন মতামত বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছাড়াই কমিটি নেতৃবৃন্দ একক ভাবে ও জোড়পূর্বক এ কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। এই লাশ দাফন বাবদ টাকা আদায়ে স্থানীয়দের কোন সম্মতি না থাকলেও কমিটি নেতৃবৃন্দ সভাপতি তফিজ উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক ও এলজিইডি কর্মকর্তা প্রকৌশলী আব্দুল কাদের, সদস্য লাল মিয়া ও সোলায়মান,নুরুল ইসলামসহ কতিপয় সন্ত্রাসীরা জোড়পূর্বক এই টাকা উত্তোলনে লিপ্ত রয়েছেন বলেও জানান তারা। এছাড়া উত্তোলনকৃত এই টাকার কোন রশিদও দিচ্ছেননা এই টাকা উত্তোলনকারীরা। টাকা উত্তোলনের স্বার্থে যারা টাকা দিতে পারছেনা বা টাকা দিতে আপত্তি করছেন তাদের লাশ ওই কবরস্থানে দাফনও করতে দিচ্ছেননা করবস্থান কমিটি। এভাবে টাকা উত্তোলন করা হলেও কবরস্থানের মান উন্নয়নে কার্যকর কোন ভূমিকাও রাখছেনা এই কবরস্থান পরিচালনা কমিটির নেতৃবৃন্দ।

গত কয়েকদিন যাবত সরেজমিন তথ্য সংগ্রহকালে কবরস্থানের কোষাধ্যক্ষ রমজান আলীর খাতায় লাশ দাফন বাবদ টাকা উত্তোলনের কিছু হিসাব থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালের ৩ মার্চ মৃত্যুবরণকারী খারজানা উত্তরপাড়ার মিয়া উল্লাহর ছেলে ও সেনা সদস্য রাজ্জাকের দাফন বাবদ ফি আদায় করা হয় ১২ হাজার টাকা। একই বছরের ২৩ জুন একই গ্রামের গোলজারের মেয়ের লাশ দাফন বাবদ ১৫শ, ৮ সেপ্টেম্বর উত্তরপাড়ার আব্দুস ছবুর মুন্সীর স্ত্রী দাফন বাবদ ৫ হাজার, ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল পূর্বপাড়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা রহিমুদ্দিনের স্ত্রী দাফন বাবদ ৫ হাজার, ২২ এপ্রিল কাতুলী আলমের দাফন বাবদ ১৫শ, ২৮ এপ্রিল ঝিনাইপাড়াস্থ নুরু ইসলামের দাফন বাবদ ৭ হাজার, ৪ মে উত্তরপাড়ার আব্দুল মালেকের মেয়ের দাফন বাবদ ১৫শ টাকা।

গত ১৭ ই আগস্ট মৃত্যু বরন করে ফিরোজ বেগম। কিন্তু ফিরোজা বেগমের পরিবার কবস্থানের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় তাকে এই কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয়নি।এ নিয়ে মৃত মা ফিরোজা বেগমের লাশ দাফন করতে না পারা ফিরোজা বেগমের ছেলে ভুক্তভোগী খারজানা উত্তরপাড়ার মনির হোসেন জানান, গত ১৭ আগস্ট সকালে মৃত্যুবরণ করেন তার মা ফিরোজা বেগম। কবরস্থান পরিচালনা কমিটির দাবীকৃত ওই ২০ হাজার টাকা দিতে না পারায় তার মাকে ওই কবরস্থানে দাফন করতে দেয়া হয়নি। এ কারণে বাধ্য হয়ে তিনি বাড়ীর পাশে তার মায়ের লাশ দাফন করেন বলেও জানান তিনি।

ধর্মীয় নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ও সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভুত ভাবে লাশ দাফন বাবদ এ ফি আদায়ে স্থানীয় হতদরিদ্র পরিবার গুলো চরম সমস্যার সম্মুখিন হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন খারজানা ঘোনাপাড়া বায়তুন নূর জামে মসজিদের ঈমাম মো. কালাচাঁন মুন্সী।
খারজানা কবরস্থান পরিচালনা কমিটি সদস্য লাল মিয়া লাশ দাফন বাবদ টাকা উত্তোলনের কথা স্বীকার করে জানান, নির্দিষ্ট পরিমান কোন টাকা নেয়া হচ্ছেনা। যদিও অতীতে এ টাকা নেয়ার নিয়ম না থাকলেও এখন কবরস্থানে মাটি ভরাটসহ নানা প্রয়োজনে এবং মৃত ব্যক্তির পরিবারের সামর্থ অনুসারে এই ফি নেয়া হচ্ছে।

তবে এ প্রসঙ্গে ও বক্তব্য গ্রহণের উদ্দেশ্যে কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং খাগড়াছরি এলজিইডি কর্মকর্তা প্রকৌশলী আব্দুল কাদের বাসায় অবস্থান করা স্বত্তেও নানা ছলচাতুরির মাধ্যমে বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত ছিলেন। এ স্বত্তেও বুধবার তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে অসংখ্যবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি।
এছাড়াও কমিটির সভাপতি তফিজ উদ্দিন অতি বয়োবৃদ্ধ ও শয্যশায়ী থাকায় মানবিক কারণে তার বক্তব্য গ্রহণ করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে পোড়াবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আজমত আলী জানান, খারজানা কবরস্থানে লাশ দাফন বাবদ ২০ হাজার টাকা ফি নির্ধারণ ও আদায় করার কোন অভিযোগ তিনি এখনও পাননি। তবে যদি এ ধরণের অপরাধ সংগঠিত হয় তাহলে তিনি পরিষদের পক্ষ থেকে এই অপকর্ম বন্ধ ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলেও জানান তিনি।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।