স্বাধীন বাংলার প্রথম দৈনিকের সম্পাদক আমান উল্লাহ আর নেই

বাংলাদেশের প্রথম দৈনিক পত্রিকা দৈনিক ‘বাংলাদেশ’র সম্পাদক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ট সহচর আমান উল্লাহ খানের ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

আমান উল্লাহ খান বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ১৯৭৩ সালে বগুড়া-৫ আসন থেকে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য হন। এছাড়াও তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক আবাসিক প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আমান উল্লাহ খান ১০ মার্চ অসুস্থ হয়ে পড়লে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের নিউরো মেডিসিন বিভাগে তাকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল। তিনি কিডনি, হার্টসহ নানা ধরনের জটিল রোগে ভুগছিলেন।

আমান উল্লাহ খান ১৯৩৮ সালে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার জয়লাজুয়ান গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

১৯৬৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরামর্শে তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তাকে দৈনিক ইত্তেফাকের উত্তরাঞ্চলীয় ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন। সাংবাদিকতায় যোগদানের মাধ্যমে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। ষাটের দশকে বগুড়া জেলার রাজনীতি ও সাংবাদিকতায় যারা ত্যাগ স্বীকার করে নানা প্রকার রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হন, তাদের মধ্যে আমান উল্লাহ খান অন্যতম। ১৯৬৩ সালে তিনি বিএ পাস করেন। ১৯৫৪ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষার্থী থাকা অবস্থায় চান্দাইকোনায় যুক্তফ্রন্টের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন। ১৯৫৭ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে অধ্যয়নকালে পাবনা জেলা ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এসময় একজন বলিষ্ঠ সংগঠক এবং সুবক্তা হিসেবে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৬১ সালে বগুড়া আযিযুল হক কলেজ ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে সামরিক আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং কারারুদ্ধ হন এবং তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে মামলা করা হয়।

মুক্তিলাভের পর তিনি বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালে বগুড়া সদর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে তিনি ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জনসভায় ভাষণ দেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে খুবই স্নেহ করতেন।

১৯৬৭ সনে বগুড়া জেলা শ্রমিকলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি জেলা কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি বগুড়ার ইতিহাস সিরিজের অন্যতম গ্রন্থ আজকের বগুড়া প্রকাশ করেন। এই সময়ে তাকে বগুড়া প্রেসক্লাবে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয়।

১৯৬৯ হতে ১৯৭৪ সন পর্যন্ত তিনি বগুড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৯ সানে ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে তিনি বগুড়ায় নেতৃত্ব দেন। এসময় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে তিনি আত্মগোপন করে থাকা অবস্থায়ও কার্যক্রম চালিয়ে যান।

১৯৭১ সালে তিনি ক্যাপ্টেন এম মুনসুর আলীর প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক গঠিত বগুড়া জেলায় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য ৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির তিনি অন্যতম সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। এ সময় পাকহানাদারদের সাথে নিয়ে রাজাকার-আলবদর বাহিনী তার জয়লাজুয়ান গ্রামের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং সর্বস্ব লুট করে।

মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের উষালগ্নে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর শেরপুরের পার্ক মাঠে (বর্তমানে মহিলা কলেজ চত্বর) মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে তিনি প্রথম বিজয় পতাকা উত্তোলন করেন। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর ১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি বগুড়া তথা উত্তরবঙ্গ হতে সর্বপ্রথম সংবাদপত্র ‘দৈনিক বাংলাদেশ’ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করেন।

আমান উল্লাহ খানের সম্পাদনায় কিছুদিনের মধ্যেই দৈনিক বাংলাদেশ উত্তর জনপদে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়। ১৯৭৪ সালে তিনি সাংবাদিক ডেলিগেশনের অন্যতম সদস্য হিসেবে ব্যাংকক সফর করেন। ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে তিনি বগুড়া-৫ শেরপুর-ধুনট আসন থেকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

তিনি আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তিনি আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠিত হলে তিনি বগুড়া জেলা বাকশালের দ্বিতীয় সম্পাদক মনোনীত হন।

১৯৭৮ সালে তিনি ঢাকায় অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতাদের সম্মেলনে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর তিনি বগুড়া তথা শেরপুর-ধুনট এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সমর্থকদের উজ্জীবিত করার জন্য গ্রামে গ্রামে ছুটে বেড়ান।

একদিকে উত্তরাঞ্চলের প্রথম পত্রিকা দৈনিক বাংলাদেশ-এর সফল সম্পাদক, অপরদিকে দৈনিক ইত্তেফাকের ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি হিসেবে উত্তর জনপদে তার পদচারণা তাকে সাংবাদিকতায় খ্যাতির শীর্ষে তুলে দেয়। ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি তার নিজ গ্রামে একটি হাসপাতাল ও জয়লা জুয়ান ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন।

প্রবীন এই রাজনীতিবিদ সাংবাদিকের প্রথম জানাজা বাদ আসর শহরের আলতাফুন্নেসা খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। এর পর দ্বিতীয় জানাজা বাদ মাগরিব বগুড়া প্রেসক্লাব চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় এবং রাতে উপশরে তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

শুক্রবার সকালে তার গ্রামের বাড়িতে চতুর্থ জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার কথা আছে।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।